
জিঞ্জিরাম নদী ও সীমান্ত বাজার।
রাজিবপুর বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র একটি উপজেলা।এই উপজেলার পূর্বে মেঘালয়, পশ্চিমে চিলমারীও গাইবান্ধা, উত্তরে রৌমারীও দক্ষিণে জামালপুর জেলা অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম ছোট একটি উপজেলা জনসংখ্যা মাত্র এক লক্ষের কাছাকাছি। এই উপজেলার দারিদ্র্যের হার ৭৯.৮ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে চারজনই দরিদ্র।
এই উপজেলার দুইটি ইউনিয়ন নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন সদর থেকে।নদী ভাঙ্গনের ফলে প্রতিনিয়ত এখানখার মানুষকে যুদ্ধ করে যেতে হয়।এই উপজেলার প্রধান আয় আসে কৃষি থেকে।কিন্তু প্রতিবছর বন্যার কারণে বা অতিবৃষ্টির কারণে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি এই উপজেলার সংকর মাধবপুর গ্রামের সন্তান। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী এই অঞ্চলটিতে প্রবেশ করতে পারেনি।কোদালকাটির চরসাজাই ও শংকর মাধবপুরে তে গণহত্যা হয়েছিল কিন্তু সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নানা সমস্যার জর্জরিত দরিদ্রের কষাঘাতে নিমজ্জিত এই উপজেলাটিত রয়েছে ওপার সম্ভাবনা। রাজিবপুরে প্রধান সমস্যা এর নদী ভাঙ্গন সোনাভরী, জিনজিরাম ও ব্রক্ষ্রপুত্র নদী দ্বারা এই উপজেলাটি বেষ্টিত।উপজেলা শহর থেকে সোনাভরি নদীর দূরত্ব মাত্র ৫০০ মিটার।একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত কোদাকাটির প্রায় ৬৫ শতাংশ অঞ্চল এখন নদীগর্ভে বিনীল হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্থ কয়েক হাজার পরিবার এবং প্রায় দশ হাজার একরের মতো ফসলি জমি।দ্বিতীয় সমস্যা বন্যা। এখানে প্রায় প্রতিবছর বন্যায় সময় প্রায় ৭০% এলাকা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়। জিনজিরাম নদী থেকে আকর্ষিক বন্যায় প্রায় ২০-২৫ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়। যার ফলে ফসলি নষ্ট হয়ে শত শত টাকার ক্ষতি হয় প্রতিবছর। নদীতে নাব্যতা না থাকার কারণে অল্প একটু বন্যা হলেই পানি লোকালয়ে চলে আসে।অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চলের মানুষগুলোর স্থান হয় আশ্রয়কেন্দ্রে। তৃতীয় সমস্যা দারিদ্র্য। এখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য হওয়ার কারণ তাদের এখানে কোন শিল্পায়ন বা কলকারখানা না থাকার কারণে কর্মসংস্থান সুযোগ খুবই কম।অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করেন।কিছু মানুষ টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি ও রাজধানীতে গিয়ে রিকশাচালানোর সহ দিনমজুরেরএর কাজ করেন।এখানে শিক্ষার হার অনেক কম এর কারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়েই প্রচুর শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।পরবর্তী সমস্যা গুলোর মধ্যে রয়েছে এখানে সরকারি কর্মকর্তা আসেন তাদের অধিকাংশ আসেন পানিশমেন্টাল বদলি হিসেবে। যার ফলে দুই একজন ব্যাতিক্রম বাদে অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে দূর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারীতার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সুশাসনের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।অঞ্চলটির আরও একটি সমস্যা হলো মাদকের অবাধ বিচরণ।মেঘালয় থেকে কাছে হওয়ার এখানে মাদক অনেকটাই সহজলভ্য ও বাংলাদেশে অন্যতম মাদকের একটি রুট এটি।যার ফলে যুবসমাজের একটি বড় অংশ এই ভয়াবহ নেশার সাথে জড়িত। যার ফলে যাদের খেলাধুলাও সাংস্কৃতিক কাজে ব্যস্ত থাকার কথা তারা মাদকের ভয়াল থাবায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দশ বছর আগেও উপজেলায় যে পরিমাণ খেলাধুলা ও কালচারাল ইভেন্ট হতো এখন সেটা খুবই সীমিত। এরপরও গত দশ-পনেরো বছরে এই অঞ্চলে ব্যপক উন্নয়ন হয়েছে। এই উপজেলার রয়েছে প্রচুর সম্ভাবনা। ব্রক্ষ্রপুত্র নদীকে পরিকল্পনা মোতাবেক

চররাজিবপুর উপজেলা
বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব থেকে রৌমারী পর্যন্ত নদীর খনন, নদী ভাঙ্গন ও উভয় পাশের ভুমির পুনরুদ্ধার করার প্রকল্প নিয়ে এর আওতায় ড্রেডগিং করিডর, রিভার করিডর, স্পিল চ্যানেল, ব্যাংক প্রোটেকশন, ফ্লড প্লেইন,রিক্লাইমেড ল্যান্ড বাস্তবায়ন করা গেলে বগুড়ার শেরপুর, গাইবান্ধা, জামালপুরের ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, রাজিবপুর, রৌমারী, চিলমারী অঞ্চলের নদীর উভয় পাশের প্রায় ১ কোটি লোকের নতুন করে পুনর্বাসন করা সম্ভব। পাশাপাশি উদ্ধার হবে কয়েক লক্ষ জমি।নদী তার নাব্যতা ফিরে পেলে এর দুই পাশে পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।নদীপথে ভারতে পণ্য সরবরাহ করা গেলে ও বর্ডার হাটকে আরও আধুনিকায়ন করে বড় করা গেলে আরও কয়েকহাজার পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।বন্যা প্রতিরোধক বাধ নির্মাণ করা সম্ভব হলে খাদ্য উৎপাদন দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যাবে।মাদকের রুট বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষা ক্ষেত্রেও উপজেলাটি কে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। উপজেলাটির প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন পাবলিক ইউনিভার্সিটি অধ্যয়নরত রয়েছেন।পাশাপাশি জাতীয় বাজেটে রাজিবপুরের জন্য স্পেশাল বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে দরিদ্র কমানোর জন্য। শিক্ষার হার বাড়াতে গ্রামে গ্রামে বয়স্ক শিক্ষা, শিক্ষার্থীরা যাতে ঝরে না পড়ে সেই জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে।স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হবে যাতে করে মানুষ সঠিক চিকিৎসা সেবা পায়। একটু কিছু হলে ময়মনসিংহ বা ঢাকায় যেতে না হয় সেই জন্য হাসাপাতালটি কে ১০০ শয্যায় রুপান্তরিতকরণ করতে হবে ও লোকবল সংখ্যা বাড়াতে হবে।কর্মসংস্থান এর জন্য ট্রেনিং সেন্টার করে দক্ষ শ্রমিক যাতে বিদেশে পাঠানো যায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।রাজিবপুর রৌমারীর মধ্যে একটি এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন স্থাপন করে কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। রৌমারী বন্দর আধুনিকায়ন করা গেলে এর সুফল রাজিবপুর উপজেলার জনগণও পাবে।একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি সকলের সুপরিকল্পনায় এগিয়ে যাবে এই প্রত্যাশা রেখে আজকের লেখার ইতি টানছি।
সিফাত ভূঁইয়া
প্রকাশক, দৈনিক কুড়িগ্রাম সংবাদ
Leave a Reply