প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন
একটি ছোট বীজ যেমন একদিন বিশাল গাছ হয়ে ওঠে,তেমনি মানুষের ছোট উদ্যোগ একদিন বড় পরিবর্তনের জন্ম দেয়।উইলো গাছ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যথানাশক ওষুধ অ্যাসপিরিন আবিস্কার হয়েছে।এই অ্যাসপিরিনই বিশ্বের আবিস্কৃত প্রথম অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ। এভাবেএকটি সাধারণ গাছ পৃথিবীর অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে। বাঁচিয়েছে পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ।একটাগাছ,একটা ধারণা—পৃথিবী বদলে দিতে পারে।তেমনি কোন সঠিক অর্থকরী উদ্ভিদকে নির্বাচন এগিয়ে নিতে পারে পশ্চাৎপদ কোন জেলা বা অঞ্চলের অর্থনীতি বা সমাজকে।দেশের উত্তরের প্রান্তিক জেলা কুড়িগ্রাম কিভাবে এগিয়ে যাবে সে নিয়ে আজকের এ লেখায় নিজস্ব কিছু ভাবনা বা গবেষণা তুলে ধরছি।
কুড়িগ্রাম দেশের এমন একটি জেলা যেখানে কোন শিল্প কারখানা নেই। মানুষের কর্ম সংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় বেকারত্বের ও দারিদ্রের হার অত্যন্ত বেশি।স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরও এখানে কোন শিল্প কারখানা গড়ে ওঠেনি।বর্তমানে তরুণ শিক্ষিত জনগোষ্টীর মাঝে জেলাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য অফুরন্ত প্রেরণা ও গভীর অনুভূতি কাজ করছে। জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে জেলার নিজস্ব সম্পদের শতভাগ ব্যবহার প্রয়োজন।মূল বিষয়ে আলোচনায় যাবার আগে বিশ্বের কয়েকটি দেশের অর্থনীতিরশুন্য থেকে কিভাবে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল তা আলোকপাত করা প্রয়োজন।
জাপানে ২য় বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের বছর গুলোতে অস্বাভাবিক খাদ্যাভাব,মূল্যস্ফীতি ও ব্যাপক চোরাকারবারি ব্যবসায় অর্থনীতি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। দেশের মোট চাহিদার ৯৯% তেল, ৮২% কয়লা,৯১% প্রাকৃতিক গ্যাস,৯৯% লৌহ এবং ৬৭% কাঠ বিদেশ থেকে আমদানী করতে হতো। এরকম পরিস্থিতিতে তাঁরা দিশেহারা হয়ে না পড়ে, নিম্নমানের ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরী করত । পরবর্তীতে তাঁরা ধীরে ধীরে উন্নত প্রযুক্তি,রোবটিকস,গাড়ি এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পের নেতৃত্বে চলে আসে। বর্তমানে তাঁরা বিশ্বের মোট জাতীয় আয়ের একাই শতকরা ১০ শতাংশ আয় করে থাকে।তাঁদের মূলনীতি – গুণগত মানের সাথেআপোষ না করা,নিয়মিত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং শ্রমের প্রতি সম্মান ।জাপানীরা মনে করে তাঁরা যে কাজ করছে, তা তাঁরা দেশের জন্য এবং নিজের জন্য করছে।
১৯৫০ এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের পর দেশটি খুব দরিদ্র ছিল। প্রথমে তাঁরা সস্তা পোশাক, খেলনা ,জুতো ও সাধারণ ইলেকট্রনিক্স পন্য তৈরি করত। পরবর্তীতে স্যামসাং,এলজি,হুন্ডাই এর মতো ব্রান্ড তাঁদেরকে বিশ্বে অন্যতম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করেছে।তাঁদের উন্নয়নের চাবিকাঠি হলো শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ,সরকারি পরিকল্পনা ও রপ্তানীমূখী অর্থনীতি।১৯৮০ এর দশকে তাঁরা ছোট ছোট যন্ত্রাংশ,পোশাক ও সস্তা ইলেকট্রনিক্স তৈরি করে রপ্তানি শুরু করে।
১৯৮০ এর দশকে চীন ছোট ছোট যন্ত্রাংশ,পোশাক ও সস্তা ইলেকট্রনিকক্স তৈরী করে রপ্তানি শুরু করে। পরবর্তীতে তাঁরা বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকারি দেশ হিসেবে মোবাইল ফোন,গাড়ি,সৌর প্যানেল থেকে শুরু করে স্প্রে প্রযুক্তিতে এগিয়ে যায়।তাঁদের উন্নয়নের মূলভিত্তি হলো শ্রম নির্ভর শিল্প। এরপর থেকে ধীরে ধীরে তাঁরা প্রযুক্তিতেও এগিয়ে গেছে অনেক পথ।
নেদারল্যান্ডস কৃষি নির্ভর দেশ হিসেবে ফুল, সব্জি ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করত। আজ তাঁরা বিশ্বে ২য় বৃহত্তম কৃষি পণ্য রপ্তানিকারকদেশ । তাঁরা গ্রীন হাউস টেকনোলজি ও জল ব্যবস্থাপনা দিয়ে আধুনিক কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।নেদারল্যান্ডস এরসফলতার মূলমন্ত্র হলো বিজ্ঞান ভিত্তিক কৃষি,পানি নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষি নির্ভর ছিল। পরবর্তীতে গার্মেন্টস শিল্প,ওষুধ,চামড়া ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।স্বল্প খরছে মান সম্পন্ন উৎপাদন,নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ এবং ধীরে ধীরে প্রযুক্তি নির্ভরতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশও আজ উন্নয়নের দ্বার প্রান্তে।
আমাদের আলোচ্য বিষয় কুড়িগ্রাম জেলার সামষ্টিক উন্নয়ের ক্ষেত্রে কি ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় এবং তার ওপর আলোকপাত করা।উপরোক্ত দেশ গুলোর উন্নয়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন কোন মডেলটি কুড়িগ্রাম জেলার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী।কুড়িগ্রাম জেলার জনশক্তি,ভৌগোলিক অবস্থান,নদ-নদী এবং সার্বিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় কুড়িগ্রামের জন্য নেদারল্যান্ড মডেলটি বেশ উপযোগী। আমাদের দেশেও কৃষি হতে পারে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি।
শিল্প খাত বা শিক্ষ খাতা বা যে কোন অকৃষি খাত, কৃষি ছাড়া বিকশিত হতে পারে না। কুড়িগ্রাম জেলার অগ্রযাত্রা শুরু হতে পারে বা যা হয়েছে তা হলো কৃষির মাধ্যমে।জেলার জনসংখ্যা ২৩ লাখের কিছু বেশি এবং এই জনসংখ্যা ৫ থেকে ৬ লাখ লোক চর এলাকায় বসবাস করে এবং চর এলাকার আয়তন মোট ভূমির ২২%। কুড়িগ্রামের চর অঞ্চলে এখন ধান,গম,ভুট্রা ও বিভিন্ন ধরণের সবজি যেমন- টমোটো,মিষ্টি কুমড়া,লাউ,সরিষা,চিনাবাদাম,মরিচ,আদা ইত্যাদি উৎপাদিত হচ্ছে।এছাড়াও চীনা চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এই অঞ্চলের মানুষ উন্নত জাতের ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছে। এ সকল উৎপাদিত পণ্য কৃষক যাতে সংরক্ষণ করে রাখতে পারে তার সুযোগ করে দেয়া প্রয়োজন। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য যাতে ন্যায্য মূল্য পায় তা নিশ্চিত করা। কৃষক একবার ন্যায্য মুল্য পেলে তা পরবর্তী বছরে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াবে এবং এভাবে ক্রমবর্ধমান কৃষি অকৃষি খাতের বিকাশে বীজ বপন করবে।
কুড়িগ্রাম এমন একটি জেলা যেখানে কোন শস্য বা উদ্ভিদ দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জন্মে এমন কোন অর্থকরী ফসল বা উদ্ভিদের রেকর্ড নেই। যেমন- দেশে আলু সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় মুন্সিগজ্ঞে,ধান বেশি উৎপাদিত হয় ময়মনসিংহে, পাট বেশি উৎপাদিত হয় ফরিদপুরে, পিয়াজ বেশি উৎপাদিত হয় ফরিদপুর,পাবনা,রাজবাড়ি ও যশোর, সারা দেশেসরিষা উৎপাদনে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রথম স্থানে রয়েছে, বিশেষ করেউল্লাপাড়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সরিষা চাষ হয়।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা এবংনীলফামারীসহ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের জেলা গুলোতেও সরিষা চাষেরপরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।কুড়িগ্রামের উন্নয়নের জন্য সে ফসলগুলো বেশি উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হবে যেগুলো খরা,বন্যা,নদী ভাঙ্গনের শিকার হবে না,বেশি শ্রমের প্রয়োজন নেই এবং অধিক রাসায়নিক সার ও কীট নাশকের ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত নয় এবং মূল খাদ্য ধান উৎপাদনের সাথে প্রতিযোগী নয়। সেক্ষেত্রে সুপারিকে একটি মূল অর্থকরী ফসল হিসেবে নির্বাচন করা যেতে পারে।
সুপারি এমন একটি অর্থনৈতিক উদ্ভিদ যে এর সাথে আরো কয়েকটি অর্থনৈতিক উদ্ভিদের যোগসূত্র রয়েছে। সুপারি চাষাবাদ করলে অন্য অর্থকরী উদ্ভিদও অনায়াসে চাষ করে বিভিন্নভাবে লাভবান হওয়া যায়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে ২০২৫ সালে কুড়িগ্রামে ৩৭০০ হেক্টর জমিতে সুপারির চাষ হয়েছে। এতে জেলায় সুপারি উৎপাদন হয়েছে ।জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুপারি উৎপাদিত হয় রাজারহাট উপজেলায়। এই উপজেলায় এবার ১ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ১১৪ টন সুপারি উৎপাদিত হয়েছে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সুপারি লালমনিরহাট ,রংপুর,গাইবান্ধা,বগুড়া,খুলনা এবং ঢাকা সহ দেশের ২০ টি জেলায় সরবরাহ করা হয়। সুপারি চাষে সাথে সাথী ফসল হিসেবে লটকন,হলুদ,আদা ইত্যাদি চাষ করা যায় এবং যা লাভজনক। সুপারি চাষের সাথে চুইঝাল নামে আর একটি অত্যাবশ্যকীয় উদ্ভিদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কুড়িগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় চুই ঝালের চাষ করে ভাগ্য ফিরছেশতশত কৃষকের। খরচ কম ও লাভ বেশি থাকায় বাড়ির উঠান কিংবাবাগানের সুপারির গাছ, আম গাছ, শিমুল গাছ, জিগা গাছ, সজনা গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছে চুই গাছের কাটিং লাগিয়ে বাণিজ্যিক ভাবে এমসলা জাতীয় ফসলের চাষ করছেন স্থানীয় কৃষক । বাজারে এর ব্যাপকচাহিদা থাকায় তা ভাল দামে বিক্রি করে লাভবানও হচ্ছেন তাঁরা। এতেস্বচ্ছলতা ফিরেছে তাঁদের জীবন–জীবিকায়। গাছ লাগানোর তিন বছর পর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৭ টি গাছে লাগানো চুই ঝালের গাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় হয়েছে। একজন কৃষক একটি শিমুল গাছ, একটি আম গাছ ও একটি কাঠাল গাছের ছুই ঝাল বিক্রি করে আয় করেছেন ৬০ হাজার টাকা।তিনি এই টাকা দিয়ে দুইট মাঝারি সাইজের গরু কিনেছেন। একসময় গরু পালন করে স্বাবলম্বীতার মাধ্যমে তার পক্ষে আবাদি জমি ক্রয় করা সম্ভব। এভাবে সারকুলার বা চক্রাকার অর্থনীহি জেলার তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।চুই ঝালে সেচ দেয়ার প্রয়োজন নেই। সার ও কীট নাশকের দরকার পড়ে না। অন্য কোন ফসলের উৎপাদনে কোন বাঁধার সৃষ্টি করে না। এ ধরণের ফসল আমাদের মতো জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অধিকাংশ কৃষকের প্রধান আয়ের উৎস সুপারির বাগানে পান চাষ।কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকের বসত বাড়ির সঙ্গে সুপারিএবং পানের বাগান এই এলাকার একটি ঐতিহ্য। অর্থকরী ফসলেরমতই প্রতিটি চাষি তাদের বসত ভিটায় আবাদ করছে সুপারি এবংসুপারি গাছেই পানের চাষ। এই অঞ্চলের সুপারি এবং গাছের পানদেশের কিছু কিছু জায়গায় অধিক চাহিদা থাকায় লাভবান হয়ে এইসুপারি পানের আবাদের পরিধি বাড়ছে।
সুপারি গাছের সাথে গোল মরিচের চাষ: গুল্ম জাতীয় গোলমরিচ গাছদেখতে অনেকটা পান গাছের মতোই। গোলমরিচের গাছ অন্য গাছবিশেষ করে সুপারি গাছকে অবলম্বন করে বেড়ে ওঠে। প্রায় ৪ বছরেএকটি গোল মরিচের গাছ পূর্ণতা পায়। তখন প্রতিটি গাছে ১ থেকেআড়াই কেজি পর্যন্ত গোল মরিচ উৎপাদন হয়।হবিগজ্ঞের পাহাড়ি এলাকায় খাসিয়া উপজাতির লোকেরা সুপারির গাছে সাথে বাণিজ্যিকভাবে গোল মরিচ চাষ করছে।কুড়িগ্রামেও এর সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা যেতে পারে।
সুপারির খোলক থেকে পরিবেশ বান্ধব প্লেট তৈরী:
সুপারি ব্যবহার করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ,অঞ্চল ও জেলা প্রক্রিয়াজাতকরণ ,বাণিজ্যিকভাবে প্লেট উৎপাদন শিল্পে গড়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে।বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুপারি উৎপাদিত হয় ভারতে এবং ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে processed areca nut”, “boiled areca”, “cut areca” শিল্প হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরী করেছে। কেরালা রাজ্যের ঠানো,এর্ণাকুলাম,ত্রিশূর অঞ্চলে সুপারি বাগান ভিত্তিক কৃষি ও প্রসেসিং শিল্প গড়ে ওঠেছে।কেরালায় সুপারির বর্জ্য দিয়ে বায়োডিগ্রেডবল প্লেট তৈরী একটি বড় শিল্প । নেপালের ঝাপা,মোরাং,সুনসারি জেলায় সুপারি কান্ড দিয়ে পরিবেশ বান্ধব প্লেট,বাটি,ট্রে তৈরী করা হয়।শ্রীলংকা প্রক্রিজাত সুপারি ভারত,পাকিস্তান এবং মালদ্বীপে রফতানি করে। ক্যান্ডি ও কুরুনেগালা অঞ্চলে শত শত প্রসেসিং ইউনিট আছে।
সুপারি গাছের খোল গ্রামে খুবই সহজলভ্য। এ খোল দিয়েই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে নান্দনিক তৈজসপত্র তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থান থেকে দুই টাকা পিস দরে সুপারি গাছের খোল সংগ্রহ করা হয়।খোলগুলোকে নিমপাতা ও লেবুর রস যুক্ত পানি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে রোদে শুকিয়ে নেয়া হয়। এরপর পাতার খোল ছাঁচের মেশিনে বসিয়ে তাপ এবং চাপ প্রয়োগ করে নানা আকৃতি দেয়া হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোলাকার বাটি,গোলাকার প্লেট,চৌকোণা প্লেট,লাভ প্লেট, চামুস এবং ট্রে সহ ১০ ধরণের জিনিস প্রস্তুত করা যায়।বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, রেষ্টুরেন্ট,দোকানে প্লাস্টিকের পরিবর্তে সুপারি গাছের খোল দিয়ে তৈরী জিনিসের ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান প্রস্তুত কারকরা। পঞ্চগড় জেলায় ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে একটি কারখানায় দৈনিক ১০০০ থেকে ১২০০ পিস প্লেট,বাটিসহ বিভিন্ন ধরণের তৈজসপত্র তৈরী হচ্ছে।প্রতি পিস প্লেট, বাটি ৭-১৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। প্লাস্টিকের থেকে দাম একটু বেশি হলেও পরিবেশ সুরক্ষায় এর বিকল্প নেই বলে মনে করেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞগণ। সবচেয়ে ভালো দিক হলো ব্যবহারের পর ফেলে দিলে এটি পঁচে জৈব সার হয়। পঞ্চগড় ছাড়াও দেশের পিরোজপুর,ঝালকাঠি এবং লক্ষীপুর জেলায় সুপারির খোলস থেকে উন্নতমানের পরিবেশ বান্ধব তৈজস পত্র তৈরী করা হচ্ছে।ফলে একদিকে কৃষক যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে অন্য দিকে পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় পরিবেশের উপকার হচ্ছে। সুপারির খোল এবং ছাল থেকে বাদামী,লাল এবং সবুজ প্রভৃতি প্রাকৃতিক রং পাওয়া যায় যা কাপড় রাঙাতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন কারুপণ্যের দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় নকশা তৈরী করতে পরিবেশ বান্ধব এ রং ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
দেশে সবচেয়ে বেশি সুপারি উৎপাদিত হয় লক্ষীপুর জেলায়। অপর তিনটি শীর্ষ স্থানীয় সুপারি উৎপাদনকারি জেলা হলো কক্সবাজার,ভোলা এবং সাতক্ষীরা। কুড়িগ্রাম যদিও সুপারি উৎপাদনে শীর্ষ জেলাগুলোর তালিকায় নেই তবুও কুড়িগ্রামে যে পরিমাণ সুপারি উৎপন্ন হয় তা দিয়ে দেশি ও বিদেশী অভিজ্ঞতার আলোকে কুড়িগ্রামে সুপারি প্রসেসিং ও পরিবেশ বান্ধব প্লেট শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।এ ধারণা জেলার পরিবেশ,মানুষের দক্ষতা,বাজার চাহিদা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে মানানসই।দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প্ এবং কৃষি বিভাগ সমন্বিতভাবে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ সহ কৃষক ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক:অধ্যক্ষ,কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।
Leave a Reply