মতামত
বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে আসন্ন নির্বাচনকে টার্গেট করে সুনির্দিষ্ট দু’টি বলয় প্রকাশ্যে জানান দিচ্ছে। একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যাদের রয়েছে দীর্ঘ ৪৭ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার; অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যাদের রয়েছে দীর্ঘ ৮৪ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার।
দুটি দলেই ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা ২০ বছর জোটবদ্ধ রাজনীতি করেছে। এমনকি রাজনীতির ময়দানে “বিএনপি-জামায়াত” নামে পরিচিতি পায় তারা। দুটি দলেই টানা ১৬ বছর আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট রেজিম কর্তৃক নিপীড়িত ও জুলুমের শিকার।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে। দলটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না এটা অনেকটা নিশ্চিত। ফলে আওয়ামী লীগ শূন্য রাজনীতির মাঠে এক নম্বর ও দুই নম্বর দল কে হবে সেটার একটা প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিএনপি তার মিত্র দলগুলোকে কাছে টানার চেষ্টা করছে; জামায়াতও সমমনা ইসলামী দলসহ অপরাপর দলগুলোকে কাছে টানবে এটাই স্বাভাবিক।
এদিকে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দল ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের দোসরগিরি করার কারণে বর্তমান প্রেক্ষাপটে উক্ত দলগুলো রাজনীতিতে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদ-জিওপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ, হেফাজতে ইসলাম, গণতন্ত্র মঞ্চ এই দলগুলোর সম্ভবনা তৈরি হয়েছে। ফলে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে আরো একটি নির্বাচনী জোট হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
সুতরাং আগামী জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্রিক দলগুলোর সমীকরণ দাঁড়াবে এরকম—–
১) বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের জোট
২) জামায়াত ও সমমনা ইসলামী দলের জোট
৩) বিকল্প তৃতীয় জোট (তারুণ্য ও সমমনা দলের জোট)
একটা কথা বলে রাখা দরকার, এই তিন জোটের নেতৃত্বে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকারী অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলোই থাকবে। সুতরাং অভ্যুত্থানে অবদানের দিক থেকে কম বেশী থাকলেও কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিদ্বেষের কারণে কোন দলকে হেয় প্রতিপন্ন করার সুযোগ নেই; কোন নেতার অবদানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে; জনগণ যাকে ভোট দিবে তারাই সরকার গঠন করবে। পার্লামেন্টে শক্তিশালী অপজিশন গণতন্ত্রকে সুসংহত করে। গত সাড়ে ১৫ বছরে পার্লামেন্টে দুর্বল ও গৃহপালিত বিরোধী দল থাকার ফলাফল আমাদের সকলের জানা। যদিও বিএনপি বলছে, তারা আগামী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে “জাতীয় সরকার” গঠন করবে। সেক্ষেত্রে বিএনপি সহ সব দলেরই সরকারে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
এটা জেনে রাখা দরকার, গণঅধিকার পরিষদ-জিওপি দীর্ঘদিন বিএনপির রাজপথের মিত্র দল হিসেবে অপরাপর দলগুলোসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও যুগপৎ আন্দোলন করে আসছে! সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারীর ইলেকশন বর্জন করে। আসন্ন নির্বাচনে গণঅধিকার পরিষদ কোন জোটের সাথে ইলেকশনে যাবে, নাকি স্বতন্ত্র ইলেকশন করবে এরকম স্পষ্ট ঘোষণা গণঅধিকার পরিষদ দেয় নি। কারণ এখনো সরকার বা নির্বাচন কমিশন আগামী জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেয় নি; নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হয় নি। তবে গণঅধিকার পরিষদ এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্তকরণে যাচাই বাছাইয়ের কাজ করছে। শীঘ্রই হয়তো ৫০-১০০ টি আসনে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, গণঅধিকার পরিষদ কি ২-৫ সিটের রাজনীতি করছে? গণঅধিকার পরিষদ কি বিএনপি’র পেটের ভিতরে ঢুকে পড়েছে? ভিপি নুর বিএনপি’র বি টিম হিসেবে কাজ করছে কিনা? এরকম নানা প্রশ্ন জনমনে রয়েছে; কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ ও ভিপি নুরের প্রতি বিদ্বেষের কারণে ইচ্ছে করেও নানা প্রোপাগাণ্ডা ছড়াচ্ছে। এসবের জবাব হলো, গণঅধিকার পরিষদ বিএনপির সাথে রাজনৈতিক জোট বা নির্বাচনী জোট করলে সেটা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই করবে। ভবিষ্যতের পাওয়ার শেয়ারিংয়ের নানা হিস্যা মিললে গণঅধিকার পরিষদ বিএনপির সাথে নির্বাচনী জোট করতে পারে। জোটের রাজনীতি বাংলাদেশে একটি স্বাভাবিক বিষয়। তাছাড়া বিএনপি ও জামায়াত দুটি দলই বিগত ১৬ বছরে মজলুম রাজনৈতিক দল। সেক্ষেত্রে গণঅধিকার পরিষদ নিপীড়িত ও মজলুম দল বিএনপির সাথে নির্বাচনী জোট করলে দোষের কিছু আছে বলে মনে করি না। তাছাড়া জামায়াত ইসলামী ২০ বছর বিএনপির সাথে জোটে থেকেছে। তাতে কি জামায়াত অস্তিত্বহীন হয়েছে? সুতরাং বিএনপির সাথে গণঅধিকার পরিষদ জোট করলে সেটা হিসাব নিকাশ করেই করবে। আগে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হোক, তারপর বিবেচনা করবে গণঅধিকার পরিষদ; এতে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কিছু নেই।
তবে,
গণঅধিকার পরিষদ যেহেতু তারুণ্য ও নতুন রাজনীতিকে ধারণ করে সেক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে তৃতীয় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বা নির্বাচনী জোটের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে চায়। এক্ষেত্রে গণঅধিকার পরিষদ, এনসিপি, এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ, হেফাজতে ইসলাম প্রভৃতি দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে বাংলাদেশ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিতে উজ্জীবিত হতে পারে।
————————
এড. এস.এম. নুরে এরশাদ সিদ্দিকী
উচ্চতর পরিষদ সদস্য (সর্বোচ্চ পলিসি ফোরাম)
গণঅধিকার পরিষদ-জিওপি
ও
সদস্য সচিব
বাংলাদেশ আইনজীবী অধিকার পরিষদ
কেন্দ্রীয় কমিটি।
Leave a Reply