কুড়িগ্রাম-০৪ আসনে স্থানীয় উন্নয়ন ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছে। তবে বাস্তবতা হলো – আমাদের দেশের রাজনীতি এখনো মূলত ভূগোলের ওপর স্বপ্ন দেখানোর রাজনীতি। রাজনৈতিক নেতারা অনেক সময় এমন প্রতিশ্রুতি দেন, যা অর্থনৈতিকভাবে বা বাস্তবিকভাবে কার্যকর নয়। অন্যদিকে জনগণও অনেক সময় এমন দাবি তোলে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার আগে প্রয়োজন ইকোনমিক ও ফিজিবিলিটি স্টাডি – কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে সেগুলো প্রায়ই অনুপস্থিত। ফলে বড় বড় স্বপ্ন দেখানোর প্রতিযোগিতাই বেশি দেখা যায়।
সাবেক মন্ত্রী জাকিরের পিটিআই উদ্যোগ – সম্ভাবনা কতটুকু ছিল?
জামালপুর ও শেরপুরে একটি করে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট (পিটিআই) আছে। কুড়িগ্রামেও একটি পিটিআই রয়েছে। প্রস্তাব ছিল রৌমারীতে আরেকটি পিটিআই স্থাপনের।
রৌমারীতে ১১৪টি এবং রাজিবপুরে আছে ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পার্শ্ববর্তী চরাঞ্চল – চিলমারীর অষ্টমীরচর (৮টি) ও নয়াহাট (১৩টি) ও দেওয়ানগঞ্জের ডাংধরা (২৩টি) ও চর আমখাওয়া (২৩টি)। সবমিলে মোট প্রায় ২৩৮ টি স্কুল এই অঞ্চলের আওতায় পড়ে।
তবে প্রশ্ন হলো এত কম সংখ্যক স্কুলের ভিত্তিতে একটি নতুন পিটিআই স্থাপন করলে তা কি সত্যিই স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলত?
উত্তর: না…
বাংলাদেশে যেসব জেলায় বা উপজেলায় পিটিআই দুইটি বা অধিক রয়েছে, সেখানে স্কুলের সংখ্যা অনেক বেশি: নড়াইলের তিন উপজেলায় ৪৯৫টি, মেহেরপুরে ৩০৯টি, নারায়ণগঞ্জে ৫৪৮টি, এছাড়া পটিয়া, শিবগঞ্জ, সোনাতলার মতো উপজেলাগুলোতেও পার্শ্ববর্তী মিলিয়ে ৪০০–৫০০ স্কুলের সাপোর্ট রয়েছে। তুলনায় রৌমারী–রাজিবপুরে এ সংখ্যা অনেক কম।
ফলে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও স্থানীয়দের নয়, বরং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আর্থিক সুবিধাই বেশি হতো ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে কাজের কন্ট্রাক্ট সবই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
চিলমারী–রৌমারী সেতু-বাস্তবতা কী বলে?
রৌমারী থেকে ঢাকার দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার। রৌমারী থেকে কুড়িগ্রাম আনুমানিক ৫০ কিলোমিটার। অর্থাৎ ঢাকা–রৌমারী–কুড়িগ্রাম রুট হবে প্রায় ৩১০ কিলোমিটার।
অন্যদিকে যমুনা সেতু হয়ে ঢাকা–রংপুর দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটার এবং ঢাকা–কুড়িগ্রাম প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার। চার লেনের কাজও প্রায় শেষ।
এ অবস্থায় প্রশ্ন: রংপুর বা কুড়িগ্রামের গাড়ি কি চার লেন বাদ দিয়ে চিলমারী – রৌমারী সেতু ব্যবহার করবে?
উত্তর: কখনোই না।
ফলে সেতুটি ব্যবহার হবে সীমিত, কিন্তু ১২–১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের ব্যয় হবে বিপুল। কর্ণফুলী টানেলের মতোই ভর্তুকি নির্ভর প্রকল্পে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকত। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন প্রকল্প কার্যকর নয়।
অবাস্তব আরও কিছু দাবি:
বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা ঘোষণা – ইত্যাদি দাবি রাজনৈতিকভাবে শোনা গেলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেগুলোর মিল কম। পরিবর্তে দরকার এমন উন্নয়ন উদ্যোগ, যা বাস্তবসম্মত এবং এলাকায় স্থায়ী সুফল দেবে।
আমাদের বাস্তব চাহিদা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কী হওয়া উচিত?
১. নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরে সুরক্ষাবাঁধ, ড্রেজিং ও নাব্যতা বৃদ্ধি জরুরি। এতে করে
1. হাজার হাজার কৃষিজমি রক্ষা পাবে
2. রৌমারী–চিলমারী ফেরি চলাচল সারা বছর সম্ভব হবে
3. চিলমারী নদীবন্দরের আধুনিকায়ন হবে
২. শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা:
1. ঢাকা–ময়মনসিংহ চারলেন প্রস্তুত
2. ময়মনসিংহ–শেরপুর ১০ মিটার প্রসারিত হচ্ছে
এই সড়ক রৌমারী পর্যন্ত নিলে যোগাযোগে গতি আসবে।
3. অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কার ও চরাঞ্চলে সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া দেওয়ানগঞ্জ রৌমারী রেললাইন চালু হলে তা হবে যুগান্তকারী উদ্যোগ।
৩. সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন: দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি।
রৌমারী–রাজিবপুরের মাঝামাঝি একটি পলিটেকনিক হলে…..
1. বাইরের শিক্ষার্থীরা আসবে
2. স্থানীয়রা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে পারবে
3. অর্থনীতিতে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মুক্তাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ বছর মেয়াদি একটি সীমিত শিক্ষা-কোটাবিবেচনা করা যেতে পারে (চাকরি কোটা নয়)।
৪. কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: দক্ষ জনবল তৈরি, বিশেষত দারিদ্র্যসীমায় থাকা পরিবারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কার্যকর।
৫. অর্থনৈতিক জোন: সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। একটি অর্থনৈতিক জোন পুরো অঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র বদলে দিতে পারে।
৬. শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন: রৌমারী বা রাজিবপুরের অন্তত একটি কলেজে অনার্স চালু করা দরকার।
বাইরের শিক্ষার্থী এলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও চাঙা হবে।
৭. অনৈতিকতার দায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ট্রান্সফার বন্ধ: বিভিন্ন জায়গায় শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের রৌমারী–রাজিবপুরে পাঠানো হয়।
ফলে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ব্যাহত হয়। যারা সৎ ও দক্ষ, তাদেরকেই এখানে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা: ভুলভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল। আপনাদের পরামর্শ ও মতামত কমেন্টে জানালে আরও সমৃদ্ধ করা যাবে।
লেখা: মেহফুজ আহমেদ
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক: বায়োলজি কিলার্স
Leave a Reply