মাইদুল ইসলাম মামুন
এই দেশ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, এটি আমার মা, আমার ভাষা, আমার আত্মার ঠিকানা। এই মাটির প্রতিটি কণায় মিশে আছে লাখো শহীদের রক্ত, ত্যাগ আর স্বপ্ন। তাই বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি হতে পারে না। এটি তার জনগণের, যাদের বিশ্বাস, শ্রম আর রক্তে গড়ে উঠেছে এই জাতি। এই চেতনার পেছনে রয়েছে আমাদের স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রাম। কিন্তু ২০২৫ সালের বাস্তবতায় এসে প্রশ্ন জাগে এই চেতনা কি কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ, না কি তা বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে?
১. ইতিহাসের ছায়া: ব্যক্তিনির্ভর শাসন ও সামরিক রাজনীতি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর দেশ সামরিক শাসনের দিকে ধাবিত হয়।
১৯৭৫-১৯৯০: এ সময় জিয়াউর রহমান ও পরে এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন। রাজনীতি দল ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে।
১৯৯১-২০২৪: গণতন্ত্র ফিরে এলেও, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা অব্যাহত থাকে। দলীয় একনায়কতন্ত্র ও ব্যক্তিপূজার রাজনীতি ক্রমশই গণতন্ত্রকে দুর্বল করে ফেলে।
২. ২০২৪-২৫: পরিবর্তনের সঙ্কেত, ২০২৪ সালের আগস্ট: ‘ছাত্র-জনতা জাগরণ’ নামে একটি বিশাল আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও স্বৈরাচারী শাসনের অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা পায়।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা:
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব নেন। সরকারের তিনটি মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়:
1. সংবিধান সংস্কার।
2. আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার।
3. ২০২৫ সালের মধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।
কিন্তু সরকার তার লক্ষ্যপূরণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
৩. দ্বন্দ্ব ও দোলাচল: সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য:
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নির্বাচন ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে সম্পন্ন করার ঘোষণা দেন। অন্যদিকে, ইউনূস নির্বাচন মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে চান। এই মতানৈক্যে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও মন্ত্রিসভায় দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়।
মানবিক করিডোর ইস্যু:
মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা ও যুদ্ধপীড়িতদের জন্য ‘হিউম্যানিটারিয়ান করিডোর’ তৈরির প্রস্তাব সরকার দিলেও, সেনাবাহিনী তা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। > সূত্র: The Times of India, The Wire, Reuters – May 2025
৪. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: আইনি কাঠামো বনাম বাস্তবতা। জানুয়ারি ২০২৫: “সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ”-এর মাধ্যমে একটি স্বাধীন কাউন্সিল গঠন করা হয়। এতে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে IDEA-র প্রতিবেদন অনুসারে, বিচারকদের একটি বড় অংশ এখনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত, যা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
৫. গণমাধ্যম: উন্নতির ইঙ্গিত, কিন্তু রয়ে গেছে শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৬ ধাপ এগিয়ে ১৪৯তম স্থান অর্জন করেছে। তবে “রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালাইসিস গ্রুপ” এর তথ্য মতে, গত আট মাসে ৬৪০ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। > সূত্র: The Daily Star, Reporters Without Borders
৬. রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও বিভাজিত জোটচিত্র:
আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার মঞ্চ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি, গণতন্ত্রী দল ও বামপন্থীরা নির্বাচন আদায়ে চাপ সৃষ্টি করছে। তবে আদর্শগত বিভাজন এবং ঐক্যের অভাব আগামী নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। > সূত্র: TBS News – May 2025
কোন ব্যক্তি বা দলের কাছে নয়, দেশটা আমাদের সবার। বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। “কোন ব্যক্তি বা দলের কাছে আমার দেশ দায়বদ্ধ নয়” এই আদর্শ কেবল আবেগ নয়, এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি।
এই আদর্শ বাস্তবায়নের পথে কয়েকটি মূল শর্ত রয়ে গেছে:
-বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা।
-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।
-সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ।
-সংবিধানিক কাঠামোর সংস্কার।
এই ভিত্তি নিশ্চিত না হলে কোনো সরকারই প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না। এই দেশ আমাদের সকলের একে বাঁচাতে হলে দলীয় আনুগত্য নয়, প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ ও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
Leave a Reply