প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষক সেই জাতির স্নায়ুতন্ত্র, যার মাধ্যমে জ্ঞানের নতুন ধারা প্রবাহিত হয়ে সৃষ্টি করে বিশ্বসভ্যতা। শিক্ষক শব্দের মূল অর্থ শেখানো বা শিখানো। একজন প্রকৃত শিক্ষকের স্বপ্ন থাকে, তাঁর শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিক্ষায় তাঁকে অতিক্রম করবে এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ আদর্শ মানুষে পরিণত হবে।
মায়ের সেবার মতোই শিক্ষকের শিক্ষাদানও অর্থমূল্যে পরিশোধের নয়। তবে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ও সমাজ থেকে শিক্ষক ন্যায্য সম্মান প্রত্যাশা করেন।
১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে শিক্ষকদের অবস্থা নিয়ে এক আন্তঃসরকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৫ সাল থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে।
শিক্ষকতার ব্রত ও নৈতিকতার মানদণ্ড: শিক্ষকতা শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, বরং একটি ব্রত, একটি আদর্শ এবং নৈতিকতার মানদণ্ড। প্রাণিত্বকে মনুষ্যত্বে রূপান্তরের কঠিন কাজটি সহজ করে তোলেন শিক্ষকই। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন;
১. শিক্ষার্থীদের পাঠে আগ্রহী করে তোলা।
২. সেই আগ্রহ পূর্ণ করা।
শিক্ষা মানুষের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে, অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় জীবনমানের উন্নয়নে শিক্ষার বিকল্প নেই। আর শিক্ষার এই উন্নয়ন মূলত নির্ভর করে শিক্ষকের মানসম্মত শিক্ষাদান ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষক: মহান আল্লাহ সুরা আহজাবে ঘোষণা করেছেন, মানবজাতির জন্য প্রতিটি নবী-রাসুলকেই শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রথম নবী হজরত আদম (আ.) থেকে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সবাই ছিলেন সু-শিক্ষার ধারক ও বাহক। নবী করিম (সা.) শিক্ষাদানে কখনো কঠোরতা করেননি, প্রহার বা গালমন্দ করেননি। তিনি সবসময় উপযুক্ত পরিবেশে জ্ঞান দান করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘস্থায়িত্বের রহস্য: কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ষোড়শ শতক থেকে একবিংশ শতক পর্যন্ত টিকে থাকা ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয়, মাত্র একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কারণ, অর্থ নয় বরং জ্ঞান বিতরণই প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘস্থায়ী করে। শিক্ষক সমাজে জ্ঞান ও মহৎ চিন্তার বীজ বপন করেন, যা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
শিক্ষকের আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: পৃথিবীব্যাপী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষকদের আত্মদানের বহু নজির রয়েছে।
এসব ঘটনা শিক্ষকের নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
শিক্ষকের অনুপ্রেরণার শক্তি: বাটারফ্লাই ইফেক্ট তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ক্ষুদ্র ঘটনার ফলেই বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর ছোট কোনো সাফল্যের প্রশংসা করেন, তবে সেই প্রশংসাই শিক্ষার্থীর মনে বিশাল আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। হয়তো সেই অনুপ্রেরণা তাকে ভবিষ্যতে একজন বিজ্ঞানী, লেখক বা সমাজসেবক বানিয়ে তুলবে।
শিক্ষক মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান: ভারকি ফাউন্ডেশনের ‘গ্লোবাল টিচার স্ট্যাটাস ইনডেক্স ২০১৮’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে গড়ে মাত্র ৩৬% শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষকদের সম্মান করে। তবে এশিয়ার দেশগুলোতে শিক্ষক পেশা সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ; বিশেষত চীনে শিক্ষকতা সর্বাধিক সম্মানজনক পেশা।
বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী এবং ১৪ লাখ শিক্ষক রয়েছেন। এদের সিংহভাগই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাই শিক্ষকতার মানোন্নয়ন ও মর্যাদা রক্ষায় সরকারি কর্মচারিদের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষক সমাজ আলোকিত করার প্রদীপ: শিক্ষককে প্রায়ই মোমবাতির সঙ্গে তুলনা করা হয় যিনি নিজে দগ্ধ হন, কিন্তু চারপাশ আলোকিত করেন। শিক্ষকের এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে।
কিন্তু সমাজ যখন অন্য পেশাজীবীদের উন্নত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করে, তখন শিক্ষকরাও একই সুযোগ প্রত্যাশা করেন। তা না হলে তাঁরা সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হীনমন্যতায় ভোগেন। তাই শিক্ষকের জীবনমান উন্নয়ন শুধু তাঁদের জন্য নয়, জাতির জন্যও অপরিহার্য।
শিক্ষকতা একটি মহান ব্রত। এই পেশায় সরকারি-বেসরকারি, স্কুল-কলেজ কিংবা মাদ্রাসা শিক্ষকের বিভাজন কাম্য নয়। প্রয়োজন সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও ঐক্য। শিক্ষক সমাজের ঐক্য মানেই জাতির ঐক্য, আর শিক্ষকের মর্যাদা মানেই জাতির মর্যাদা। তাই জাতিকে আলোকিত করতে হলে, প্রথমেই আলোকিত করতে হবে শিক্ষক সমাজকে।
লেখক: অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ
Leave a Reply