গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে নির্মিত তিস্তা সেতু অচিরেই উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। সেতুর মূল কাজ প্রায় শেষ হলেও দুই পাশের অ্যাপ্রোচ রোডের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে আমি হরিপুর তিস্তা সেতু ভ্রমণে যাই। সেখানে গিয়ে মনে হলো, দীর্ঘদিনের অবহেলিত তিস্তার চরের মানুষগুলো সেতুর দু’পাশকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের মতো পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে।
সেতুর সুরক্ষায় নির্মিত গাইড স্পারের কারণে সেখানে একটি জলাশয় সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে তেমন স্রোত নেই, বরং ভরপুর পানিতে মাছ আর পাখির আনাগোনা। এরই মধ্যে কিছু উদ্যোক্তা ভাসমান ও কাঠের রেস্তোরাঁ গড়ে তুলেছেন। অনেক দর্শনার্থী সেখানে ভোজনের আনন্দ নিচ্ছেন। স্নিগ্ধ বাতাস ও শান্ত পরিবেশ মানুষকে মুগ্ধ করছে। এ সেতুটি শুধু যোগাযোগ সুবিধাই বাড়াবে না, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্তও উন্মোচন করবে।
এ দৃশ্য দেখে প্রশ্ন জাগে—কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর সেতুর আশেপাশে কিংবা নদীতীরবর্তী এলাকায় কেন এ ধরনের পর্যটন সুবিধা গড়ে ওঠেনি? ধরলা সেতুটি জেলা সদরের কাছেই অবস্থিত। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি আঞ্চলিক পর্যটনের বড় কেন্দ্র হতে পারত। আঞ্চলিক পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জাতীয় আয়েরও প্রসার ঘটায়।
হরিপুর থেকে ফেরার পথে আমরা থেমেছিলাম চিলমারি নদীবন্দরে। কিন্তু হতাশার বিষয়, সেখানে দর্শনার্থীদের জন্য উপযুক্ত খাবার বা বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিক্রি হচ্ছে বাদাম, ঝালমুড়ি, চানাচুর। অথচ ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত এ ঐতিহাসিক বন্দরটির রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আব্বাস উদ্দিন আহমদের মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। অথচ আজও সেখানে কোনো পার্ক বা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় সূত্র মতে, বন্দরসংলগ্ন জমি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু করা সম্ভব হয়নি।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গোড়াই রঘুরায় মৌজায় অবস্থিত জিয়া পুকুরও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কচ্ছপ ও মাছ বিক্রি করে ২০২৪ সালে এখান থেকে প্রায় ৪ লাখ টাকা আয় হয়েছে। প্রতিদিন বহু মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। কিন্তু পর্যটনশিল্প হিসেবে এটি উন্নত করার কোনো উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয় কর্মসংস্থান বা সরকারি আয় বাড়ছে না। অথচ সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এখানে বড় ধরনের পর্যটন হাব গড়ে তোলা সম্ভব।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন—পাহাড়, সমুদ্র বা বড় শিল্প ছাড়া কি কুড়িগ্রামে পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব? উত্তর হলো—অবশ্যই সম্ভব। গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন, চরবাসীর সংগ্রামী জীবন, নদী, হাওড়, বিল, লোকজ অনুষ্ঠান, গ্রামীণ পেশা—এসবই পর্যটনের উপকরণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রামীণ পর্যটন আজ জনপ্রিয়। যেমন—ইন্দোনেশিয়ার “desa wisata” ধারণা বা ইতালির “The Most Beautiful Villages of Italy”।
গ্রামীণ পর্যটনকে কেন্দ্র করে তৈরি করা যেতে পারে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা—যেমন ভ্রমণকারীরা গ্রামের পুকুর থেকে মাছ ধরে রান্না করবেন, খাসি বা গরুর দুধ সরাসরি পাবেন, জৈব সবজি খাবেন। এ ধরনের উদ্যোগ বিদেশি পর্যটক ছাড়াও দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করবে। আমাদের দেশে ইতোমধ্যেই কিছু উদাহরণ আছে—সিলেটের সাতকড়া দিয়ে গরুর মাংস, মৌলভীবাজারের সাতরঙা চা, দিনাজপুরের হাসের মাংস—এসবের টানেই পর্যটকরা ভিড় জমায়।
কুড়িগ্রামে চুইঝালের বিপুল উৎপাদন রয়েছে, অথচ এখানকার মানুষের প্লেটে তা সচরাচর দেখা যায় না। অথচ দক্ষিণাঞ্চলে চুইঝালের জন্য মানুষ দূরদূরান্ত থেকে ছুটে যায়। কুড়িগ্রামেও এ পণ্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন আকর্ষণ তৈরি করা সম্ভব। তাছাড়া ধরলার টিআর বাঁধে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ, নদীতীরে রক মিউজিয়াম, জিয়া পুকুর সাজানো—এসব উদ্যোগ নিলে দর্শনার্থী বাড়বে।
কৃষি পর্যটনও হতে পারে নতুন সম্ভাবনা। কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস এলাকায় কৃষি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। ঘোড়ার মেলা, কুমির বা সাপের খামার, গবেষণা কেন্দ্র—এসবও শিক্ষার পাশাপাশি পর্যটনে অবদান রাখবে।
পর্যটনকে বলা হয় “অদৃশ্য রপ্তানি”। এটি যত সৃজনশীলভাবে ভাবা যায়, তত নতুন নতুন ধারণা বের হয়। কুড়িগ্রাম শিল্পকারখানাহীন হলেও ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটনশিল্পে বিপ্লব ঘটাতে পারে। কেবল “কুড়িগ্রাম” নামটিকেই ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করে উন্নত পণ্য ও সেবার মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যটনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন সম্ভব।
Leave a Reply