রাজিবপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা: কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর। ব্রহ্মপুত্রের বুকে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলা, যেখানে স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু এই সরকারি হাসপাতালটি যেন নামেই হাসপাতাল। চিকিৎসকের সংকটে জরুরি বিভাগ পর্যন্ত চালাতে হচ্ছে একজন মেকানিক দিয়ে!
প্রতিদিন অসংখ্য রোগী চিকিৎসা নিতে এসে ফিরে যান হতাশা নিয়ে। কেউ পান না ওষুধ, কেউ পান না চিকিৎসকের দেখা। অথচ, ১০ বছর আগে নির্মিত অপারেশন থিয়েটার (ওটি) আজও চালু হয়নি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, আর রোগীরা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একজন বাবা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে ছুটে বেড়াচ্ছেন। ডাক্তার নেই, স্যাকমো নেই—কেউ নেই!
আশ্চর্যের বিষয় হলো, রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকের পরিবর্তে খুঁজছিলেন হাসপাতালের একজন মেকানিককে! কারণ স্থানীয়দের মতে, এই হাসপাতালে ইমার্জেন্সি বিভাগের চিকিৎসা চালান একজন মেকানিক, যার আসল কাজ হাসপাতালের জেনারেটর দেখভাল করা!
একজন কর্মচারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “স্যার, ডাক্তার না থাকলে রোগীরা তো কাউকে চাইবে। স্যাকমোও সবসময় থাকে না। তাই জেনারেটর দেখভালের লোকটাই মাঝে মাঝে ইমার্জেন্সিতে দায়িত্ব নেয়।”
নতুন ভবনে স্থাপন করা অপারেশন থিয়েটার ১০ বছর ধরে বন্ধ পড়ে আছে। অস্ত্রোপচারের জন্য থাকা আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
একজন নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সরঞ্জাম আছে, কিন্তু লোক নেই। ডাক্তার না থাকলে এসব যন্ত্র দিয়ে কী হবে? রোগীরা কষ্টে মারা গেলেও অপারেশন করার কেউ নেই।”
সরকারি হাসপাতাল হলেও এখানে স্যালাইন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিছুই পাওয়া যায় না। সবকিছুই রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হয়।
ভর্তি হওয়া মুক্তা আক্তার বলেন, “আমি অন্তঃসত্ত্বা, প্রস্রাবের ইনফেকশন হয়েছে। ওষুধ, স্যালাইন সব বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এত গন্ধ যে হাসপাতালে থাকতে পারছি না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো ব্যবস্থা নেই।”
একই অবস্থা মোমেনা বেগমের। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন, কিন্তু চিকিৎসার বদলে তাকে ময়মনসিংহ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, “১২ হাজার টাকা খরচ করে ময়মনসিংহে টেস্ট করালাম, আবার এখানে এনে ৭ দিন ধরে বসে আছি। চিকিৎসা কি আদৌ হবে?”
অন্যদিকে, অন্তঃসত্ত্বা নাতনিকে নিয়ে আসা আমিনুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে ভবন আছে, মেশিন আছে, কিন্তু চিকিৎসা নেই। একজন ডাক্তার পর্যন্ত নেই! প্রশাসন কি একবারও এসে দেখে না?”
রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহা. সারোয়ার জাহান বলেন, “আমাদের এখানে ২৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা, কিন্তু মাত্র ২ জন আছেন। আমরা সংকটের মধ্যে থেকেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
তার অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যখন ট্রেনিং থাকে, তখন যেতে হয়। তবে আমি অনুমতি নিয়েই যাই।”
জরুরি বিভাগে মেকানিক দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, “এখানে ডাক্তার এবং স্যাকমো দিয়েই ইমার্জেন্সি চলে। যদি কেউ অনুমোদিত না হয়ে দায়িত্ব পালন করে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যই নয়, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, চিলমারী ও রৌমারীর বিভিন্ন এলাকা থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু তারা যে পরিষেবা পান, তা এক কথায় বিপর্যয়কর!
স্থানীয়দের দাবি, এই হাসপাতালের ডাক্তার সংকট অবিলম্বে দূর করতে হবে। অপারেশন থিয়েটার চালু করতে হবে, জরুরি বিভাগে চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
একজন স্থানীয় প্রবীণ নেতা বলেন, “আমাদের এলাকা এমনিতেই অবহেলিত। এখন যদি হাসপাতালও না চলে, তাহলে আমরা যাব কোথায়? সরকারের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”
রাজিবপুরের হাসপাতাল যেন এক মৃত্যুকূপ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসক নেই, জরুরি ওষুধ নেই, অপারেশন হয় না, আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বালাই নেই। কিন্তু এই অব্যবস্থাপনার দায় কে নেবে?
সরকার যদি দ্রুত জনবল নিয়োগ না করে, তাহলে এই হাসপাতাল কেবল একটি পরিত্যক্ত ভবন হিসেবেই থেকে যাবে, যেখানে রোগীরা আসবেন কষ্ট নিয়ে, আর ফিরে যাবেন অসহায়ত্বের বোঝা নিয়ে!
Leave a Reply