পাঠকের চিন্তা:
মোঃ ফরিদুল ইসলাম, তরুন লেখক:
মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়ে নারীদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ এক অনন্য স্থান দখল করে রেখেছে। এই অধ্যায়ে যাঁদের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই হওয়া উচিত, তাঁদের একজন হলেন বীরপ্রতীক তারামন বিবি। সাহস, ত্যাগ, এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রতীক এই নারীর জীবন ও অবদান আজও জাতির কাছে প্রেরণার উৎস হলেও, তাঁকে ঘিরে ইতিহাসের নিঃসঙ্গতা আমাদের ব্যথিত করে।
কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া তারামন বিবির জীবন ছিল এক সংগ্রামী কাব্য। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করা, অস্ত্র পরিবহন ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অপরাজেয় যোদ্ধা। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব। তবে, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও তাঁর নামটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ বা মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা প্রশ্নবিদ্ধ।
তার মৃত্যুবার্ষিকীতে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি: গতকাল, ১ ডিসেম্বর ২০২৪, ছিল বীর প্রতীক তারামন বিবির মৃত্যুবার্ষিকী। রাজিবপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছোট পরিসরে তাঁর কবরে দোয়া ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো বড় আয়োজন দেখা যায়নি। দুঃখজনকভাবে, এই মহান নারী মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানাতে এতটাই সীমিত আকারে আয়োজন করা হয়, যা জাতি হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
যে তারামন বিবি একাত্তরে নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন, তাঁকে যথাযথ মর্যাদা দিতে না পারা আমাদের জাতীয় দায়বদ্ধতার প্রতি উদাসীনতার পরিচায়ক।
শংকর মাধবপুরের বধ্যভূমি যা এখন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি: তারামন বিবির জন্মস্থান শংকর মাধবপুর শুধু একজন নারী মুক্তিযোদ্ধারই পরিচায়ক নয়, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক ভয়াবহ গণহত্যার সাক্ষী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা এই গ্রামে নির্মম গণহত্যা চালিয়েছিল, যা শংকর মাধবপুরকে একটি বধ্যভূমিতে পরিণত করে। কিন্তু এই বধ্যভূমির স্মৃতি আজ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি স্মৃতিফলক স্থাপনের মাধ্যমে এই বধ্যভূমির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে।
জাতীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন: বীর প্রতীক তারামন বিবির অবদান জাতির জন্য অবিস্মরণীয় হলেও, তাঁর প্রতি আমাদের রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা লক্ষণীয়। তাঁর নামে আজও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। নেই কোনো গবেষণা কেন্দ্র বা স্মৃতিসৌধ। তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান তুলে ধরার জন্য এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নিচে এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক দাবি উপস্থাপন করা হলো:
তারামন বিবি স্মরণে আমাদের করণীয়: বীর প্রতীক তারামন বিবি আমাদের জাতীয় গৌরবের প্রতীক। তাঁর জীবনের বীরত্বের কাহিনি কেবল গর্বের নয়, এটি আমাদের জাতীয় দায়বদ্ধতারও স্মারক। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে হলে আমাদের এখনই উদ্যোগী হতে হবে।
তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে তারামন বিবি ও তার মতো মুক্তিযোদ্ধারা চিরজাগ্রত থাকবেন, যদি আমরা তাদের বীরত্বের কাহিনি বুকে ধারণ করে সেই চেতনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। এ কাজটি শুধু দায়িত্ব নয়, আমাদের জাতিগত ঋণ।
বীর প্রতীক তারামন বিবি আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের গর্ব। তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা নিজেকেই সম্মানিত করি। বিজয়ের মাসে বীরপ্রতীক তারামন বিবির প্রতি এই শ্রদ্ধা নিবেদনই হোক আমাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার প্রেরণা।
Leave a Reply