1. atik@kurigramsongbad.com : atik :
  2. editor1@kurigramsongbad.com : কুড়িগ্রাম সংবাদ :
  3. sifat@kurigramsongbad.com : sifat :
  4. siteaccess@pixelsuggest.com : কুড়িগ্রাম সংবাদ :
সাম্প্রতিক :
ভূরুঙ্গামারীতে ঔষধ আইন পরিপালন ও অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে সচেতনতামূলক সভা ভূরুঙ্গামারীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাদকসেবীর এক মাসের কারাদণ্ড ভূরুঙ্গামারীতে মাদকবিরোধী মানববন্ধন, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ভূরুঙ্গামারীতে প্রথম হাসি প্রজেক্টের ক্যপাসিটি বিল্ডিং ওয়ার্কশপ ভূরুঙ্গামারীতে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ, পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতার বার্তা ভূরুঙ্গামারীতে মাদক প্রতিরোধে মানববন্ধন ভূরুঙ্গামারীতে ১৭৪০ মিটার অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল জব্দ করে ধ্বংস করল প্রশাসন ভূরুঙ্গামারীতে পুলিশ-বিজিবির যৌথ অভিযানে গাঁজার গাছ সহ মাদককারবারি আটক জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ে কুড়িগ্রামে সেরা নাগেশ্বরী, সম্মাননা পেলেন নার্স নাজমা দুধকুমার নদে সাঁড়াশি অভিযান, জব্দ ২ হাজার ৫০০ মিটার চায়না জাল

ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর চীনের বাঁধ: বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ স্থায়ী ক্ষতির মুখে

  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৩ আগস্ট, ২০২৫
  • ৮৩৬ বার পড়া হয়েছে

প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন, অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ 

পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু এই জীবনদায়ী পানিই আজ বিশ্বে সংঘাত ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের ২.২ বিলিয়ন মানুষ এখনো নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে ভুগছে। মানবদেহের ৬০-৭০ শতাংশ পানি, যা সকল বিপাকীয় কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য। কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পানির ভূমিকা অতুলনীয়। পৃথিবীতে মাত্র ৩ শতাংশ মিঠা পানির মধ্যে মাত্র ১.২ শতাংশ পানযোগ্য হওয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।

ইতিহাসে পানির জন্য সংঘাত নতুন নয়। জর্ডান নদীর পানি নিয়ে সিরিয়া-ইসরায়েল সংকট, নীল নদের পানি নিয়ে মিশর-সুদান-ইথিওপিয়ার বিরোধ এবং সিন্ধু নদের পানি নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনা এর অন্যতম উদাহরণ। সাম্প্রতিক সময়ে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ। এই নদের ওপর চীনের বিশাল বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প ভাটির দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির জন্য এক গভীর সংকট তৈরি করেছে।

ব্রহ্মপুত্র: এক নজরের ভৌগোলিক পরিচয়

হিমালয় পর্বতমালার কৈলাস শৃঙ্গের কাছে ৬,৬৩৮ মিটার উচ্চতার অংসি হিমবাহ থেকে ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি। তিব্বতে ‘ইয়ারলুং সাংপো’ নামে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে এটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ‘শিয়াং’ নামে প্রবেশ করে। আসামে এর নাম হয় ‘দিহাং’ এবং দিবং ও লোহিত নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ‘ব্রহ্মপুত্র’ নাম ধারণ করে। এরপর কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এটি ‘যমুনা’ নামে প্রবাহিত হয় এবং পরিশেষে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়।
২৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদের পানির মূল উৎস হিমবাহ গলা পানি (২০-৩০%) এবং বৃষ্টিপাত (৭০-৮০%)। ব্রহ্মপুত্রের মোট পানিপ্রবাহে চীনের অবদান প্রায় ৩০-৩৫%। এই নদের অববাহিকায় মোট ৫৮টি উপনদী রয়েছে, যার মধ্যে ২২টি চীনে, ৩৩টি ভারতে এবং ৩টি বাংলাদেশে অবস্থিত।

চীনের মহাপ্রকল্প: বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। চীন তিব্বতের মালভূমিতে ইয়ারলুং জাংপো নদীর ওপর ‘মেডগ হাইড্রো পাওয়ার স্টেশন’ (Medog Hydro Power Station) নামে এক বিশাল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। ভারতের অরুণাচল সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০-৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রকল্পটি ২০২৯ সালে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।

নদীটি এখানে প্রায় ২,০০০ মিটার গভীর গিরিখাত সৃষ্টি করেছে, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সুযোগ তৈরি করেছে। স্বাভাবিক সময়ে পানির স্রোত ৫ মি/সেকেন্ড থাকলেও বর্ষাকালে তা বেড়ে ২০ মি/সেকেন্ড পর্যন্ত পৌঁছায়। এই তীব্র স্রোতকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে চীন।

উৎপাদন ক্ষমতা: ৬০ গিগাওয়াট (চীনের বর্তমান বৃহত্তম বাঁধ ‘থ্রি গর্জেস ড্যাম’-এর চেয়ে তিনগুণ বেশি)।

নির্মাণ ব্যয়: ১৭ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
প্রকল্পের ধরণ: অংসি হিমবাহ থেকে ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ধাপে ধাপে পাঁচটি বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
এই প্রকল্প পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এটি যুক্তরাজ্যের সারা বছরের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।

রান-অফ-দ্য-রিভার’ প্রকল্প: চীনের দাবি ও বাস্তবতা
চীন দাবি করছে, এটি একটি “রান-অফ-দ্য-রিভার” (Run-of-the-river) প্রকল্প, যেখানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে এবং বড় জলাধার না থাকায় ভাটির দেশে পানিপ্রবাহে কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এই দাবি নিয়ে সন্দিহান।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA): এই ধরনের প্রকল্পের পানি সংরক্ষণের ক্ষমতা খুব কম বা নেই বললেই চলে। এটি ঋতুভিত্তিক পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল, ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক তারতম্য ঘটে।

বিশ্বব্যাংক এবং ইন্টারন্যাশনাল রিভারস (IR): চীনের বাঁধগুলো নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত করে ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশে পানির ঘাটতি সৃষ্টি করবে, যা চাষাবাদ ও নদীর বাস্তুতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলবে।

আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট (IWMI): বাঁধ পলির স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করবে, যার ফলে বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের ভূমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। পদার্থবিজ্ঞানের ধারাবাহিকতার সূত্র (Law of Continuity) অনুযায়ী, নদীর প্রস্থ কমালে স্রোতের বেগ বাড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদন समान রাখতে গেলে চীনকে নদীর পানিপ্রবাহে পরিবর্তন আনতেই হবে, যা ভাটির দেশগুলোর জন্য একটি অশনিসংকেত।

সম্ভাব্য পরিণতি: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর হুমকি
ব্রহ্মপুত্র কেবল একটি নদ নয়, এটি হাজারো প্রাণ-প্রজাতির জীবনধারা। এর অববাহিকায় রয়েছে বিস্তীর্ণ চর, জলাভূমি, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মাছের প্রজনন ক্ষেত্র।
মৎস্যসম্পদ: এই নদে ২০০টিরও বেশি প্রজাতির মিঠা পানির মাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ইলিশ, রুই, কাতলা, মৃগেলের মতো মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বন্যপ্রাণী: এই অববাহিকায় গাঙ্গেয় ডলফিন, ঘড়িয়াল, কুমির, হাতি, গণ্ডার, বাঘসহ অসংখ্য প্রাণী ও পরিযায়ী পাখির বসবাস। পানির প্রবাহ কমে গেলে এদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের মতো অভয়ারণ্যগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পলিপ্রবাহ বন্ধ: কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল স্টেকলারের মতে, এই বাঁধ ভাটির দিকে পলিমাটির প্রবাহ কমিয়ে দেবে। অথচ এই পলি বাংলাদেশের কৃষিজমির জন্য অত্যন্ত জরুরি পুষ্টি উপাদান বহন করে।

পানি সম্পদ গবেষক ড. তপন কুমার পালের মতে, “একের পর এক বাঁধ নির্মাণ মানে বাংলাদেশের সম্পদকে হত্যাকাণ্ডের শামিল।”

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: বাংলাদেশের জীবন-জীবিকার সংকট বাংলাদেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের প্রায় ১৫-১৮টি জেলার ৩ কোটিরও বেশি মানুষ সরাসরি ব্রহ্মপুত্রের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি, মৎস্যজীবী, নৌ-পরিবহণ, বালু উত্তোলন এবং পর্যটনসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এর দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে। দেশের জিডিপিতে ৩.৬% অবদান রাখা মৎস্য শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পানিপ্রবাহের পরিবর্তনে বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়বে, যা অগণিত মানুষকে আর্থিক সংকটে ফেলবে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি চীনের থ্রি গর্জেস ড্যামের কারণে পৃথিবীর অক্ষের অবস্থান প্রায় ২ সেন্টিমিটার সরে গিয়েছে এবং দিনের দৈর্ঘ্য ০.০৬ মাইক্রোসেকেন্ড বৃদ্ধি পেয়েছে (সূত্র: NASA)। এছাড়া এই বাঁধের কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভূমিকম্পের হার বেড়েছে এবং ভূমিধসের ঘটনাও ঘটেছে। প্রস্তাবিত মেডগ বাঁধটি থ্রি গর্জেস ড্যামের চেয়ে তিনগুণ বড় হওয়ায় এর ভূতাত্ত্বিক প্রভাব আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বড় বাঁধ ভূমিকম্প, ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, পানির সংকট এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বাংলাদেশের উদ্বেগ ও কৌশলগত অবস্থান: বাংলাদেশের মোট পানি সম্পদের ৬৭% আসে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে। বর্তমানেই দেশে প্রায় ৪০% পানির ঘাটতি রয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলে খরা পরিস্থিতি তৈরি করছে। চীন ও ভারত যদি তাদের পরিকল্পিত প্রায় ২০০টি বাঁধ নির্মাণ করে, তবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে চরম পানি সংকটে পড়তে পারে। ভাটির দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর পানি-রাজনীতির মারপ্যাঁচে আটকা পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

করণীয়: সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পথ ভবিষ্যৎ পানিযুদ্ধ এড়াতে এবং ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে একটি ত্রিপক্ষীয় (চীন-ভারত-বাংলাদেশ) চুক্তির কোনো বিকল্প নেই।

১. কূটনৈতিক তৎপরতা: বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশনের আওতায় নিজের অধিকার আদায়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।

২. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং দক্ষিণ এশীয় পানি উদ্যোগের (SAWI) মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা আদায় করতে হবে।

৩. জনসচেতনতা: দেশের অভ্যন্তরে পানির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাপক জনসচেতনতা এবং সামষ্টিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করতে হবে।

ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর চীনের এই বাঁধ কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট। সময়োপযোগী ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটেগরিতে আরো খবর


Kurigram Songbad © 2025. All Rights Reserved.
Built with care by Pixel Suggest
error: Content is protected !!