কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রাম জেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ। গত পাঁচ বছরে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও কর্মীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজটি ধীরে ধীরে উন্নতির শিখরে উঠেছে।
শিক্ষক সংকট, আবাসন সমস্যা, এবং শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই (প্রায় ৮০ শতাংশ) দরিদ্র পরিবারের সন্তান—এসব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক ও প্রশাসনের আন্তরিক সহায়তায় শিক্ষার মানে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
প্রশাসন, সুধী সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় চলতি বছর রংপুর বিভাগের মধ্যে ফলাফলের দিক থেকে কলেজটি তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। বদলে গেছে কলেজের শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতি।
কলেজের অধ্যক্ষ মীর্জা মোঃ নাসির উদ্দিন, উপাধ্যক্ষ ও শিক্ষকবৃন্দের সম্মিলিত সাফল্যে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ এখন রংপুর বিভাগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে আটটি জেলার শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্সে পড়াশোনার জন্য এই কলেজকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। কয়েক বছর আগে যেখানে উচ্চমাধ্যমিকে মাত্র তিনজন ছাত্রী পড়ত, সেখানে এখন তিন শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে।
কলেজের কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মিত অনুশীলন ও ব্যবহারিক ক্লাসে শিক্ষকদের নিষ্ঠা শিক্ষার পরিবেশকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। ১৪টি বিষয়ে অনার্স কোর্স থাকলেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর।
প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে শিক্ষার্থীরা কলেজ ড্রেস পরে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়। এরপর কলেজের মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সময় অধ্যক্ষ নিজেই মূল গেটে অবস্থান করেন যাতে কেউ বাইরে যেতে না পারে।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা মিছিলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ পাঁচ বছর ধরে নিষিদ্ধ—এ বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের ঐক্যমত রয়েছে।
প্রতিদিন সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের বাধ্যতামূলক অ্যাসেম্বলি হয়। ঝড়-বৃষ্টির দিনে তা অনুষ্ঠিত হয় কলেজের হলরুমে।
ক্লাস শুরু হলে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা ক্লাসরুম ও বারান্দায় থেকে পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণ করেন।
এই শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের ফলেই ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১৩০ জন শিক্ষার্থী বুয়েট, মেডিকেল, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
গত দুই বছরে ৫০ জনের বেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থী বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরি পেয়েছেন। চলতি বছরে ইংরেজি বিভাগের তিনজন শিক্ষার্থী নিবন্ধন পরীক্ষায় সারাদেশে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে।
প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে বেশিরভাগই চর ও দুর্গম এলাকার হতদরিদ্র পরিবার থেকে আগত। অথচ শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ৫২ জন, যেখানে প্রয়োজন ১০৮ জন। পর্যাপ্ত একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস বা ছাত্রী নিবাস নেই। চলাচলের জন্য কলেজের রয়েছে মাত্র ৮টি বাস। তবুও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শিক্ষার্থীরা দৃঢ় মনোবলে এগিয়ে যাচ্ছে।
উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন বলেন,
“আমাদের কলেজের নিয়ম-শৃঙ্খলা অনেক ভালো লাগে। এ বছর বুয়েট, মেডিকেল ও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩০ জন ভর্তি হয়েছে—এটা আমাদের জন্য গর্বের।”
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ইয়াসমীন আরা জানান,
“আগে মেয়েরা এখানে পড়ত না। এখন শিক্ষার মান উন্নত হওয়ায় আশপাশের মহিলা কলেজের চেয়ে এখানে মেয়েদের আগ্রহ বেশি।”
ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মোঃ আরিফিন সিদ্দিকী বলেন,
“আমাদের বিভাগে শিক্ষক সংকট তীব্র। মাত্র দুইজন শিক্ষক দিয়ে আমরা প্রায় ১,৪০০ শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছি। তবুও নিবন্ধন পরীক্ষায় আমাদের শিক্ষার্থীরা সারা দেশে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান পেয়েছে—এটা বিশাল সাফল্য।”
অধ্যক্ষ মীর্জা মোঃ নাসির উদ্দিন বলেন,
“বিভিন্ন প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকসহ সহকর্মীদের আন্তরিকতা ও দক্ষতার কারণে কলেজের একাডেমিক ফলাফল অত্যন্ত সন্তোষজনক। উচ্চমাধ্যমিক থেকে অনার্স পর্যন্ত সব স্তরেই আমরা ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করছি।”
Leave a Reply