রোকনুজ্জামান রোকন, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মো. মোস্তাফিজার রহমান, যিনি রাজু মোস্তাফিজ নামে সমধিক পরিচিত, সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সেন্ট্রাল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য (সদস্য নম্বর: ৫৯৩০) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এই অর্জন শুধু তার ব্যক্তিগত গৌরব নয়, বরং কুড়িগ্রামের সংবাদমাধ্যম ও প্রান্তিক মানুষের পক্ষেও এটি এক অনন্য সম্মান।
রাজু মোস্তাফিজের জন্ম এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারে। অনেকগুলো বোনের পর পরিবারে প্রথম পুত্রসন্তান হিসেবে জন্ম নেওয়ার সুবাদে স্বভাবতই রাজকীয় আদরে বেড়ে উঠেছেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই তার পোশাক-পরিচ্ছদ, চালচলন, এমনকি স্কুলে যাওয়ার সাইকেল পর্যন্ত ছিল চোখধাঁধানো বিদেশি ব্র্যান্ডের। এক কথায়, তিনি বেড়ে উঠেছেন এক রাজপুত্রের মতো পরিবেশে।
তবে প্রশ্ন জাগে—রাজকীয় জীবনযাপন করে বড় হওয়া রাজু কেন জীবনের সবচেয়ে প্রতিকূল ও চ্যালেঞ্জিং পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নিলেন?
উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, রাজুর হৃদয়ে কুড়িগ্রামের নদীভাঙা, চরাঞ্চলের দুর্গম এলাকাগুলোর অসহায় মানুষের প্রতি ছিল গভীর মমত্ববোধ। শহুরে জীবন নয়, গ্রামীণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশাই তাকে আলোড়িত করেছে বরাবর। সেই তাড়না থেকেই রাজু মোস্তাফিজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষে সাংবাদিকতার পথে পা রাখেন। প্রথমে দৈনিক রূপালী পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।
এরপর ১৯৯৩ সালে তিনি যোগ দেন বহুল প্রচারিত দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায়। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তাকে নানান প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, বারবার রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপে পড়তে হয়েছে। কিন্তু কখনো দমে যাননি রাজু। নীরবে, নিঃশব্দে কাজ করে গেছেন মানুষের জন্য।
২০১২ সালে তিনি যোগ দেন ইলেকট্রনিক মিডিয়া “৭১ টিভি”-তে, এবং এখনো ওই চ্যানেলের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার প্রতিবেদনের মূল ফোকাস থাকে প্রান্তিক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর।
রাজু মোস্তাফিজের সাংবাদিকতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল কুড়িগ্রামের ‘ফতোয়া’ ও ‘দোররা’ ইস্যুতে রিপোর্ট করা। তিনি সাহসিকতার সঙ্গে এসব সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে লেখালেখি করে তা বন্ধে ভূমিকা রাখেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তার “হাজরা” নামক এক নির্যাতিত নারীর গল্প, যাকে নিয়ে তিনি দুই বছর ধরে ধারাবাহিক রিপোর্ট করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের নজর কাড়েন। এ নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি নেতৃত্ব দিতেও সমানভাবে দক্ষ। বর্তমানে তিনি কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ক্লাবের নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।
সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজেও তিনি পিছিয়ে নেই। “এগিয়ে যাবে কুড়িগ্রাম” প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রায় ৪০ থেকে ৪২ জন গরীব অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছেন। অনেকেই ইতোমধ্যে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
নির্ভীক সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজু নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনাও করছেন সফলভাবে। তিনি কুড়িগ্রাম ঘোষপাড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক পুত্র সন্তানের জনক। তার ছেলে বর্তমানে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। তার স্ত্রী কুড়িগ্রামের একটি কলেজে অধ্যাপনা করছেন।
সবকিছু ছাপিয়ে রাজু মোস্তাফিজের স্বপ্ন—একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলের সেই প্রাণবন্ত তরুণ আজও শব্দশ্রমিক হিসেবে নিবেদিত কুড়িগ্রামের প্রান্তিক মানুষের জীবনের কথা বলার জন্য।
Leave a Reply