স্টাফ রিপোর্টার:
কড়াল গ্রাসী খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র নদ এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। এক সময় বর্ষা মৌসুমে এই নদে প্রচণ্ড স্রোত ও বিশাল জলধারা প্রবাহিত হতো, যা এখন কেবল স্মৃতি। শুকিয়ে যাওয়া নদীতে বিস্তীর্ণ বালুচর ও চরাঞ্চল তৈরি হয়েছে, কোথাও কোথাও আবাদি জমিতে রূপ নিয়েছে। ফলে নদীর নাব্যতা সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে, যা পরিবহন, কৃষি, মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
নদীর নাব্যতা সংকট ও চলাচলে বিঘ্ন
নদের গতি সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ায় ফেরি, নৌকা ও অন্যান্য নৌযান চলাচলে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিয়েছে। চিলমারী থেকে রৌমারী ও রাজীবপুর যাওয়ার সময় দ্বিগুণেরও বেশি লেগে যাচ্ছে। এমনকি ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকাও চলাচলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মমিনুল ইসলাম জানান, উপজেলার চিলমারী, নয়ারহাট ও অষ্টমীরচর ইউনিয়ন ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিভক্ত। এসব এলাকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য জোড়গাছ হাটে আসতে হয়। কিন্তু নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় তাদের দীর্ঘ পথ হেঁটে বাজারে আসতে হচ্ছে, যা শারীরিক কষ্ট ও পরিবহন ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
তেল ব্যবসায়ী ফরহাদ আলী বলেন, “আগে এক ড্রাম তেল নৌকায় আনতে ২০ টাকা ভাড়া লাগত, এখন সেই খরচ ১০০ টাকা হয়ে গেছে। নদের নাব্যতা কমে যাওয়ায় চরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।”
মৎস্যজীবীদের দুর্দশা
ব্রহ্মপুত্র নদের মাছ একসময় এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস ছিল। কিন্তু এখন নদী প্রায় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ শিকার করে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাঝিপাড়া এলাকার ফুলেল মাঝি, সুকুমার রায়সহ অনেকে জানান, “সারা দিন জাল ফেলেও ২০-৩০ টাকার মাছ পাওয়া যায় না। নদীতে মাছ নেই, তাই আমরা পেশা ছেড়ে কেউ রিকশা চালাচ্ছি, কেউ দোকানে কাজ করছি, কেউবা দিনমজুরের কাজ করছি।”
অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদী ভাঙনের শঙ্কা
সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। শ্যালো মেশিন চালিত ড্রেজার ব্যবহার করে অবাধে বালু তোলা হচ্ছে, যা সরকারকে বিপুল রাজস্ব বঞ্চিত করছে এবং পরিবেশের জন্যও মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। ইতোমধ্যে ডানতীর রক্ষা প্রকল্পের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে।
কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব
নদীর পানি কমে যাওয়ায় চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেচব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
সমাধানের উপায়
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, “ব্রহ্মপুত্র নদের পরিকল্পিত ড্রেজিং করলে নাব্যতা ফিরে আসবে এবং এটি চরাঞ্চলবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।”
নদীর এই সংকট মোকাবিলায় নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
1. পরিকল্পিত ড্রেজিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন – নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সরকারকে কার্যকর ড্রেজিং প্রকল্প নিতে হবে।
2. অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ – প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
3. চরাঞ্চলের জন্য বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা – চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে বিশেষ নৌপথ চালু করা উচিত।
4. মৎস্যজীবীদের জন্য সহায়তা – কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করে মাছের প্রজনন বাড়াতে হবে।
5. চরাঞ্চলে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প চালু করা – সহজ সেচব্যবস্থা ও উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
6. সচেতনতা বৃদ্ধি – নদী রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
ব্রহ্মপুত্র নদ পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ না করলে আগামী দিনে এ অঞ্চলের মানুষ আরও ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হবে। তাই অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
Leave a Reply